পৃথিবীর শেষ ঝরনার খোঁজে পাট ২

পৃথিবীর শেষ ঝরনার খোঁজে পাট ২

একটা তুচ্ছ ব্যান্ডের হুকুম পালন করতে হে
এর চেয়ে বড় সাজা আর কী আছে? রোজমেরি দরজা খুলে দিল।
ব্যাঙটা এল ঘরের ভেতরে। ব্যাঙটা তাকিয়ে তাকিয়ে রোজমেরিকে
সত্মা মনে মনে ভারি খুশি।
মেয়েটাকে।
লাফিয়ে লাফিয়ে
দেখল। তারপর বলল,
হাঁটুর ওপর বসাও আমায়, তুমি আমার জান
তোমার জন্যে ভাবতে ভাবতে আমি পেরেশান।
শুনতে তুমি পাও না আমার মনের আকুলতা!
ঝরনা-পাড়ে তুমি আমায় দিয়েছিলে কথা।
রোজমেরির তখন কেমন যেন লাগছে। মনটা বেচারার খারাপ হয়ে গেছে। একটা
ভেজা স্যাঁতসেঁতে ব্যাঙ তার হাঁটুর ওপর বসতে চায়, এ কেমন কথা?
কিন্তু সত্মা হুকুম দিল,

image
— ও যা বলছে তোমার তাই করা উচিত। প্রতিজ্ঞা অবশ্যই পালন করা উচিত।
রোজমেরি ব্যাঙটাকে হাঁটুর ওপর উঠিয়ে নিল। তারপর ব্যাঙটা আবার বলল,
লক্ষ্মীসোনা, লক্ষ্মীসোনা খাবার কিছু চাই
পেটে আমার খিদে আমি যা পাই তাই খাই।
শুনতে তুমি পাও না আমার মনের আকুলতা!
ঝরনা-পাড়ে তুমি আমায় দিয়েছিলে কথা।
সত্মা ব্যাঙের কথা শুনে বলল,
— যাও, যাও, জলদি করে ওর খাবার এনে দাও।
রোজমেরি রাতের খাবার এখনও খায় নি। সে নিজের খাবারের অর্ধেকটা এনে
দিল ব্যাঙকে। ব্যাঙ খুশিমনে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব খেল। তারপর ঘ্যাঙোর ঘ্যাঙ
করে বলল,
এখন আমার ঘুম পাচ্ছে ঘুম আয়রে আয়
তোমার সাথে শুয়ে পড়ব তোমার বিছানায়
ঝরনা-পাড়ে তুমি আমায় দিয়েছিলে কথা।
শুনতে তুমি পাও না আমার মনের আকুলতা!
ব্যাঙের এই কথা শুনে শরীর রি রি করে উঠল রোজমেরির!
না, না— এ কী করে হয়! স্যাঁতসেঁতে নোংরা একটা ব্যাঙের সাথে এক বিছানায়
কীভাবে শোয়া যায়? সব মানলেও এটা মানা যায় না।
কিন্তু ব্যাঙের কাণ্ড দেখে হো হো করে হেসে উঠল সত্মা। ভারি মজা পেয়েছে।
সে। আচ্ছা করে শায়েস্তা করা যাচ্ছে মেয়েটিকে। সৎমা চেঁচিয়ে উঠল,
— যাও, শুতে যাও। বিছানা করে দাও ব্যাঙটাকে। তোমার প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে
যাচ্ছ কী করে? মেয়েরা কখনও প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে না ।
রোজমেরি ব্যাঙটাকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ঘরে এল। শুয়ে পড়ল বিছানায় । ব্যাঙটা
রইল তার পাশে। একধারে জড়সড় হয়ে রোজমেরি শুয়ে রইল। সারাদিনের কাজের
ক্লান্তিতে একটুক্ষণ পরেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল রোজমেরি।
খুব সকালবেলা ।

image

আকাশে তখনও ঠিকমতো সূর্য ওঠে নি। ঘুম ভাঙল রোজমেরির। তার কানের
পাশে কে যেন ম্যাঙোর ঘ্যাঙ করছে।
– তোমায় আমি যা যা বলেছি সব তুমি করেছ। আর একটা মাত্র কাজের কথা
বলব আমি। তাহলেই তোমার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা হবে। একটা ছোট্ট কুড়াল নিয়ে
এস। আমার মাথাটাকে দু-ফাঁক করে দাও।
ব্যাঙের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল রোজমেরি। সে কাতরস্বরে বলল,
এই কাজটি আমি করতে পারব না। তুমি আমার বিরাট উপকার করেছিলে।
এখন তোমায় আমি মেরে ফেলব কীভাবে? এ কাজ আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
যা বলছি তা করতে হবে তোমায়। তোমার প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ কর। এখনও
রাত শেষ হয়ে যায় নি। কুড়াল নিয়ে এস এবং আমার মাথাটাকে দু-ফাঁক কর।
মন খারাপ করে রান্নাঘরে গেল রোজমেরি। ছোট কুড়ালটা নিয়ে এল সাথে। এই
কুড়াল দিয়ে সে কাঠ চেরাই করে। হতভাগা ব্যাঙটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
কিন্তু ব্যাঙ তখন চিৎকার করে বলল,
জলদি আমার মাথায় কুড়ালের আঘাত দাও। জলদি
রোজমেরি কুড়ালটি দিয়ে যেই-না বাড়ি মেরেছে অমনি তার জীবনের সবচেয়ে
আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল মুহূর্তে। ব্যাঙটা উধাও হয়ে গেছে। কোথাও নেই আর সেই
ব্যাঙ। বরং ব্যাঙের বদলে সামনে দাঁড়িয়ে আছে অপরূপ সুন্দর ও সুদর্শন এক যুবক ।
অবাক হয়ে রোজমেরি পিছিয়ে এল এক-পা। তার হাত থেকে খসে পড়ল কুড়ালটা।
সুদর্শন সেই যুবকের মুখে তখন হাসি। পুব আকাশ আলো করে লাল সূর্য উঠেছে
আকাশে সেই সময়।
যুবকটি বলল,
ভয় পেয়ো না আমাকে।
মিষ্টি এবং সুরেলা তার কণ্ঠস্বর ।
– আমি তোমাকে ঝামেলায় ফেলার জন্য আসি নি । একদা আমি ছিলাম একজন
রাজপুত্র। এক দুষ্টু ডাইনি আমায় জাদু করে ব্যাঙ বানিয়ে রাখে। শর্ত ছিল যদি
কোনোদিন আমি একরাত কোনো তরুণী মেয়ের সঙ্গে কাটাতে পারি তবেই তার
জাদুমন্ত্র কেটে যাবে। এটা ছিল জাদুর মায়া।
এমন সময় সত্মার ঘুম ভেঙেছে। ঘরে ঢুকেই সত্মা অবাক! কোথায় সেই ব্যাঙ ।
তার বদলে ঘরের মধ্যে আলো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক রাজপুত্র।
সত্মাকে তখন রাজপুত্র বলল,
আপনার মেয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। তারই দয়ায় মায়ায় আমি আবার
আমার পুরনো রূপ, পুরনো জীবন ফিরে পেয়েছি। আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে
করতে চাই। আমি ধনে-মানে খুবই নামকরা রাজপুত্র। আর হ্যাঁ— আপনি তো
আপনার সৎমেয়েকে এমনিতেই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে চান। আর তাড়ানোর
দরকার পড়বে না। আমি আপনার সৎমেয়েকে আমার বউ করে নিয়ে যাচ্ছি।
সত্মার মুখে কোনো কথা নেই। বেচারা একেবারে হতভম্ব হয়ে গেছে।
রাজপুত্রের মুখের দিকে সে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। কী বলবে সে? একবার তাকাল

image

রোজমেরির দিকে। মুখ হাঁ করল। কিন্তু কোনো কথা বেরুল না। এমনই অবাক
হয়েছে সে। তারপর একছুটে সত্মা চলে গেল রান্নাঘরে।
আজ নিজের হাতে নাশতা বানাল। রাজপুত্র আর রোজমেরির জন্য নাশতা
পরিবেশন করল। আর যাই হোক, রাজপুত্রের সঙ্গে তো খারাপ আচরণ করা যায় না।
রাজপুত্র আর রোজমেরির বিয়ে হল মহা ধুমধামে। রোজমেরির জীবনে নেমে এল
মহাসুখ। আনন্দ আর আনন্দ। সুখের সাগরে তারা ভাসতে লাগল।
আর হ্যাঁ— সত্মারও কপাল ফিরে গেল। তারও আর কোনোকিছুর অভাব রইল
না। রোজমেরি ছিল খুবই ভালো মেয়ে। তাই সে সত্মাকে দূরে ঠেলে দিতে পারল
না। তাছাড়া ব্যাঙ-রাজপুত্রের প্রতিজ্ঞা রক্ষার ব্যাপারে সত্মা খুব সাহায্য করেছিল।
রোজমেরিকে। কেন করেছিল সে-কথা অবশ্য আলাদা। তবে সত্মা যে বারবার
একটা কথা বলেছিল— প্রতিজ্ঞা করে কখনও প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করতে নেই। এই কথার
কারণে রাজপুত্রও সত্মার ওপর ভারি খুশি।
মহা আনন্দে তাদের দিন কাটতে লাগল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *