স্বাস্থ্য বলতে কেবল রোগের অনুপস্থিতিকে বোঝায় না। একজন মানুষের মানসিক, শারীরিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকা—এই তিনটির সমন্বয়কেই প্রকৃত সুস্থতা বলা হয়। এই সুস্থতা ধরে রাখার জন্য মানুষ চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করে, স্বাস্থ্যবিমা করে এবং জীবনযাপনে নানা বিনিয়োগ করে।
তবুও লক্ষ্য করা যায়, উন্নত চিকিৎসা সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কিছু উন্নত দেশের মানুষের গড় আয়ু প্রত্যাশার চেয়ে কম। এর পেছনে জীবনধারা, মানসিক চাপ, খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যসেবায় সমান সুযোগ না পাওয়ার মতো একাধিক কারণ কাজ করে। দীর্ঘ ও কর্মক্ষম জীবন কাটাতে চাইলে সুস্থ শরীর ও মন অপরিহার্য।
স্বাস্থ্য বলতে কী বোঝায়?
স্বাস্থ্য কোনো চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, বরং সমাজে একজন মানুষের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করার একটি সহায়ক শক্তি। সুস্থ জীবনযাপন মানুষকে অর্থবহ ও উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবন গড়তে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য হলো শরীরের নতুন রোগ, ঝুঁকি ও প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান রোগের প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি করেছে এবং অসুস্থতা নিয়ন্ত্রণ বা বিলম্বিত করার উপায় বের করেছে। তবে বাস্তবতা হলো—রোগ পুরোপুরি নির্মূল করা সব সময় সম্ভব নয়।
অসুস্থতার আগেই শরীর যে সংকেত দেয়
গুরুতর অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বহু আগেই শরীর কিছু সতর্কবার্তা দিতে শুরু করে। এই লক্ষণগুলো উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। নিচে এমন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত তুলে ধরা হলো—
. অকারণ ওজন কমে যাওয়া
যদি কোনো বড় শারীরিক পরিশ্রম বা ডায়েট ছাড়াই শরীরের ওজন হঠাৎ করে ১০ শতাংশ বা তার বেশি কমে যায়, তাহলে তা উদ্বেগের বিষয়। এর পেছনে থাইরয়েডের অতিসক্রিয়তা, মানসিক অবসাদ, ডায়াবেটিস, যকৃতের সমস্যা, পুষ্টি শোষণে ব্যাঘাত বা এমনকি ক্যানসারের মতো গুরুতর কারণও থাকতে পারে।
২. শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
হালকা কাজেই হাঁপিয়ে যাওয়া বা শ্বাসের স্বাভাবিক ছন্দে সমস্যা দেখা দিলে তা ভেতরের কোনো জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে। স্থূলতা, উচ্চতাজনিত সমস্যা বা তাপমাত্রার তারতম্যের কারণেও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। তবে হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
৩. ক্ষুধা কমে যাওয়া বা দ্রুত পেট ভরে যাওয়া
অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়া, খাবারের প্রতি অনীহা, কিংবা এর সঙ্গে বমি বমি ভাব, পেট ফাঁপা বা ওজন কমার মতো উপসর্গ থাকলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। এসব লক্ষণ হজমতন্ত্রের সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে।
৪. ঘুমের সমস্যা
ঘুমের অভাব অনেক সময় অসুস্থতার প্রাথমিক সংকেত। মানসিক চাপ বেড়ে গেলে শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, যা গভীর ঘুমে বাধা সৃষ্টি করে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম না হলে শরীর নিজেকে ঠিকভাবে মেরামত করতে পারে না, ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
৫. প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হওয়া
প্রস্রাবের রঙ শরীরের জলীয় ভারসাম্য ও কিডনির অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। পর্যাপ্ত পানি পান করার পরও যদি প্রস্রাব গাঢ় হলুদ থাকে, তাহলে তা কিডনির কার্যকারিতার সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৬. দীর্ঘস্থায়ী অবসাদ
সারাদিন কাজের পর ক্লান্ত লাগা স্বাভাবিক। কিন্তু যদি পর্যাপ্ত ঘুমের পরও সব সময় অবসন্নতা থেকে যায়, তাহলে তা থাইরয়েডের সমস্যা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, ভুল খাদ্যাভ্যাস বা পরিবেশগত প্রভাবের কারণে হতে পারে।
উপসংহার
শরীর অনেক সময় চুপচাপ সংকেত দেয়—শুধু আমাদের সচেতন হওয়া দরকার। ছোট ছোট পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিলে বড় অসুস্থতা এড়ানো সম্ভব। সুস্থ থাকতে হলে কেবল রোগের চিকিৎসা নয়, বরং জীবনযাপন, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন এবং শরীরের ভাষা বোঝাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।




















আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...