হার্টে রক্ত পৌঁছে দেওয়ার প্রধান পথ হলো করোনারি ধমনি। এই ধমনিগুলোতে চর্বি, কোলেস্টেরল বা অন্যান্য উপাদান জমে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে গেলে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এই অবস্থাকেই সাধারণভাবে করোনারি হৃদ্রোগ বলা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হঠাৎ করে এক দিনে ধমনিতে সম্পূর্ণ ব্লক তৈরি হয় না; বরং এটি দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে তৈরি হয়। ফলে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ বোঝা যায় না।
যখন ধমনির সংকোচন গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন হৃদ্পেশিতে প্রয়োজনীয় রক্ত সরবরাহ কমে যায়। তখন বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে।
লক্ষণ দেখে কীভাবে সন্দেহ করা যায়
করোনারি হৃদ্রোগের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো বুকের ব্যথা। সাধারণত বুকের মাঝামাঝি অংশে চাপ, ভারী অনুভূতি বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। শারীরিক পরিশ্রম যেমন দ্রুত হাঁটা, দৌড়ানো, সিঁড়ি ভাঙা বা ভারী কাজ করার সময় ব্যথা বাড়তে পারে এবং বিশ্রাম নিলে কমে যেতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে ব্যথা শুধু বুকেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি ঘাড়, কাঁধ, চোয়াল, পিঠ বা বিশেষ করে বাঁ হাতের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
যদি হঠাৎ তীব্র বুকে ব্যথা শুরু হয়, দীর্ঘ সময় ধরে থাকে এবং বিশ্রামের পরও কমে না, পাশাপাশি অতিরিক্ত ঘাম বমি বা বমি বমি ভাব দেখা দেয়—তাহলে তা হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতি সাধারণত তখন ঘটে যখন করোনারি ধমনির কোনো একটি অংশ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
ব্লক শনাক্তের প্রাথমিক পরীক্ষা
হার্টের রক্তনালিতে ব্লক আছে কি না তা বোঝার জন্য চিকিৎসকেরা প্রথমে কয়েকটি প্রাথমিক পরীক্ষা করতে বলেন। এর মধ্যে রয়েছে
ইসিজি (ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম)
ইকোকার্ডিওগ্রাফি
ট্রেডমিল বা এক্সারসাইজ স্ট্রেস টেস্ট
এসব পরীক্ষার মাধ্যমে হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতা, রক্তস্বল্পতার সম্ভাবনা কিংবা ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে এসব পরীক্ষায় সাধারণত নির্দিষ্ট করে বলা যায় না কোন ধমনিতে কত শতাংশ ব্লক রয়েছে।
নিশ্চিতভাবে জানার উপায়
হার্টের রক্তনালিতে কোথায় এবং কতটা ব্লক আছে তা নির্ভুলভাবে জানতে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা হলো করোনারি এনজিওগ্রাম। এই পরীক্ষার মাধ্যমে সরাসরি ধমনির ভেতরের অবস্থা দেখা যায়।
এনজিওগ্রাম কীভাবে করা হয়
এনজিওগ্রাম সাধারণত হাসপাতালে করা হয়, তবে এতে রোগীকে অজ্ঞান করার প্রয়োজন পড়ে না। রোগীর কবজি বা কুঁচকির রক্তনালি দিয়ে একটি সরু নল বা ক্যাথেটার ঢোকানো হয়। এরপর সেটি হৃদ্যন্ত্রের ধমনির কাছে পৌঁছানো হয়।
পরবর্তীতে একটি বিশেষ রঙিন তরল প্রবেশ করানো হয় এবং এক্স-রের সাহায্যে রক্তনালির ছবি তোলা হয়। এতে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়
ধমনিতে কোনো ব্লক আছে কি না
কোন ধমনির কোন অংশে সমস্যা রয়েছে
ব্লকের পরিমাণ বা শতাংশ কত
এই তথ্যের ভিত্তিতে হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ সিদ্ধান্ত নেন রোগীর স্টেন্ট বসানো প্রয়োজন, বাইপাস সার্জারি দরকার নাকি শুধু ওষুধের মাধ্যমেই চিকিৎসা করা সম্ভব।
প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
অনেকের ধারণা, এনজিওগ্রামের পরিবর্তে অন্য কোনো পরীক্ষা করালেই একই তথ্য পাওয়া যায়। বাস্তবে এখন পর্যন্ত এর সমতুল্য নির্ভুল বিকল্প নেই।
আরেকটি সাধারণ ভুল ধারণা হলো ইসিজি বা ইকোকার্ডিওগ্রাম স্বাভাবিক থাকলে হার্টের ধমনিতে কোনো ব্লক নেই। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এসব পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক হলেও ধমনিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ব্লক থাকতে পারে।
তাই হৃদ্রোগের লক্ষণ দেখা দিলে বা ঝুঁকি বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।





















আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...